কিডনি ঠিক আছে তো?

প্রভাষক.ডাঃ এস.জামান পলাশ

i67
কিডনি শরীরের পানি ও লবণের ভারসাম্য বজায় রাখে, রক্ত পরিশোধনের কাজ করে শরীরসুস্থ রাখে। কিন্তু গোলমাল যদি হয় সেই কিডনিতেই?
শরীরে প্রতিনিয়ত তৈরি হওয়া বর্জ্য গিয়ে মেশে রক্তে, সেই রক্ত যায় কিডনিতে। কিডনির সূক্ষ্ম ছাঁকনিতে শোধিত হয়ে তা সচল রাখে পুরো শরীর। এভাবে একজোড়া কিডনি সুস্থ থাকতে ভূমিকা রাখে। নিয়ন্ত্রণ করে পানি ও খনিজ লবণের (ইলেকট্রলাইট) ভারসাম্যতা। তাই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। শুধু তাই নয় রক্তের উপাদান লোহিত কণিকা তৈরির জন্য ইরাইথ্রপোয়েটিনও নিঃসরণ করে কিডনি। ক্যালসিয়ামের মাত্রা রক্তে ঠিক রাখে। এভাবে কত কাজ যে কিডনি করে! সে কারণে কিডনিতে যখন সমস্যা দেখা দেয়, অসুখ হয়তপুরো শরীরবৃত্তীয় ব্যবস্থায় বড় ধরনের গোলমাল দেখা দেয়।
সাধারণত মানুষের দেহে দুটি কিডনি থাকে। এর একটিও যদি পুরোপুরি সুস্থ থাকে, তবে আর অসুবিধা হয় না। কিন্তু বহু অসুখে উভয় কিডনিই তিগ্রস্ত হয়।

শিশুদের কিডনি রোগঃ-
কিডনির অসুখ হতে পারে সব বয়সেই। শিশুরাও আক্রান্ত হতে পারে কিডনি জটিলতায়। শিশুদের ক্ষেত্রে নেফ্রটিক সিনড্রোম, পোস্ট স্টেপটোকক্কাল গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিস, নেফ্রব্লাস্টোমা বেশি হয়।kidney_stone

নেফ্রটিক সিনড্রোমঃ-
এ অসুখে প্রতিদিন প্রস্রাবের মাধ্যমে প্রায় সাড়ে তিন গ্রাম প্রোটিন (অ্যালবুমিন) বের হয়। ফলে শরীরে প্রোটিন স্বল্পতা (হাইপো অ্যালবুমিনিয়া) দেখা দেয়। রক্তে চর্বির মাত্রা বেড়ে যায় (হাইপার লিপিডেমিয়া)। শরীরে পানি আসে (ইডিমা)।
সাধারণত দুই থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুরা এ রোগে আক্রান্ত হয়। বড়রাও এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তবে শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হয়। আক্রান্তের মুখ, বিশেষ করে চোখের চারপাশে, ফুলে যায়। হাত-পায়ে পানি আসে। কখনো কখনো পেটও ফুলে যায়। ফেনার মতো প্রস্রাব হয়। বুকে বা পেটে পানি জমলে শ্বাসকষ্ট হতে পারে।
– নেফ্রটিক সিনড্রোমে আক্রান্ত সন্দেহ হলে ২৪ ঘণ্টায় মোট প্রস্রাবে কী পরিমাণ প্রোটিন যাচ্ছে তা নির্ণয় করা জরুরি। সঙ্গে প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা ইলেকট্রলাইট, রক্তের ইউরিয়া ও ক্রিয়েটিনিন এবং লিপিড পরীক্ষা, অটোইমিউন (এএনএ, এএসওটি ইত্যাদি) পরীক্ষা পেটের আলট্রাসনোগ্রাম ইত্যাদি পরীক্ষা করা হয়।
– শিশুদের নেফ্রটিক সিনড্রোম থেকে রেনাল ফেইলুর বা কিডনি বিকল রোগ কম হয়। সাধারণত সঠিক সময়ে চিকিৎসা করলে রোগটি ভালো হয়ে যায়। সাধারণত স্টেরয়েড (প্রেডনিসোলন) সেবন, পানি পানের পরিমাণ কমিয়ে, ডাই ইউরেটিকস বা ল্যাসিঙ্ ব্যবহার করে চিকিৎসা করা হয়।কোনো শিশুর মধ্যে নেফ্রটিক সিনড্রোমের লণ দেখা মাত্র চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

পোস্ট স্ট্রেপটোকক্কাল গ্লোমেরুলোনেফ্রাইটিসঃ-
এ রোগে হঠাৎই শিশুর মুখ ও চোখের চারপাশ ফুলে যায়। প্রস্রাব কম হয়, অনেক সময় প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যায়। প্রস্রাবে প্রোটিন যায়। রক্তচাপ বেড়ে যায়। সঙ্গে মাথাব্যথা, বমিও থাকতে পারে। রক্তশূন্য হয়ে বাচ্চা ফ্যাকাসে হয়ে যায়। রোগটি স্ট্রেপটোকক্কাস আলফা ও বিটা হিমোলাইটিক নামের জীবাণুর সংক্রমণে হয়। এ জীবাণুটি সাধারণত গলা ও ত্বকে সংক্রমিত হয়। পরবর্তী সময়ে আক্রমণ করে কিডনিকে। তাই শিশুর গলা ও ত্বকে সংক্রমিত হওয়ার পর শিশুর প্রস্রাবে কোনো লণ আছে কি না তা খেয়াল করা উচিত।- এ রোগটি সাধারণত দুই থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের বেশি হয়। রোগটি যথাসময়ে চিকিৎসা করলে ভালো হয়।

নেফ্রব্লাস্টোমাঃ-
এটা এক ধরনের ক্যান্সার। তিন-চার বছর বয়সী শিশুরা এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। এ রোগে আক্রান্ত হলে পেট ফুলে যায়, পেটে চাকা অনুভূত হয়, জ্বর থাকে, প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যায়, রক্তচাপ বেড়ে যায়, ওজন কমে যায়, খাদ্যে অরুচি হয়, পেটে ব্যথা হয়। যদি কোনো শিশুর এ ধরনের লণ থাকে তবে দেরি না করে দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে হবে। রোগটি ভালো হওয়া পুরোপুরি নির্ভর করে কোন পর্যায়ে চিকিৎসা শুরু হয়েছে তার ওপর।

বয়স্কদের কিডনি রোগঃ-আা kidney-transplant-india
কিডনি ও ইউরোলজির রোগ বেশি হয় বয়স্কদের। সাধারণত যে রোগগুলো বেশি হয় তা হলো কিডনির পাথর, মূত্রনালির পাথর, মূত্রথলির পাথর, ক্রনিক রেনাল ডিজিজ বা দীর্ঘমেয়াদি কিডনি বিকল রোগ ইত্যাদি।

কিডনি ও মূত্রনালির পাথরঃ-
কিডনি, মূত্রনালি ও মূত্রথলিথতিনটি স্থানেই পাথর হতে পারে। পাথর হওয়ার রোগটি বেশি হয় পুরুষদের। ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সে পাথরের অবস্থান প্রথম ধরা পড়ে। মহিলাদের েেত্র পাথর ধরা পড়ে আরেকটু বেশি বয়সে।
মূত্রতন্ত্রে অনেক সময়ই ছোট ছোট পাথর তৈরি হয়। বেশির ভাগ সময়ই (শতকরা ৯৮ ভাগ ক্ষেত্রে) তা কোনো উপসর্গ তৈরি করে না ও ছোট আকারের পাথরগুলো প্রস্রাবের সঙ্গে বের হয়ে যায়।পাথর যখন ব্যাসার্ধে তিন মিলিমিটারের চেয়ে বেশি হয় তখন বের হতে পারে না, ফলে মূত্রনালিতে আটকে গিয়ে উপসর্গ তৈরি করে। সাধারণত কিডনি, মূত্রনালি বা মূত্রথলিতে পাথর হলে কোমর ব্যথা, পিঠ ব্যথা হয় (ব্যথা সাধারণত পাঁজরের হাড়ের নিচ থেকে কোমর পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকে)। ব্যথা শুরু হলে তা ২০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। ব্যথার সঙ্গে বমিভাব, জ্বরও থাকতে পারে।অনেকের ক্ষেত্রে প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত, পুঁজ যেতে পারে। এ ছাড়া প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া, বারবার ইনফেকশন, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়ার মতো কিছু উপসর্গও দেখা যেতে পারে।
– অনেক কারণে পাথর হতে পারে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় পানি কম খেলে, বেশি পরিমাণে মাংস জাতীয় খাবার দীর্ঘদিন খেলে, আঙুর-আপেলের জুস, কচু, ওল ইত্যাদি বেশিদিন খেলে, কোমলপানীয় বা কোল্ডডিংকস পান বেশি করলে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।- তবে অনেকের ধারণা ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার বেশি খেলে পাথর হয়থএটি মোটেও ঠিক নয়। (এ ধারণা করার কারণ পাথরে ক্যালসিয়াম থাকে বলে, বাস্তবে খাদ্যদ্রব্যের ক্যালসিয়াম এই পাথরের ক্যালসিয়ামের কারণ নয়) বরং ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার কম খেলে প্রস্রাবের মাধ্যমে অঙ্ালেট বেশি বের হয় এবং পাথর তৈরি হয়। তবে ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট খেলে পাথর হওয়ার ঝুঁকি খানিকটা বাড়ে।- দীর্ঘমেয়াদি রোগ যেমন ক্রনস ডিজিজ, হাইপার প্যারাথাইরয়ডিজম, রেনাল টিবিউলার এসিডোসিস ইত্যাদিতে কিডনিতে পাথর হতে পারে।

– কিডনি পাথরের মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগই ক্যালসিয়ামযুক্ত পাথর,
১০-১৫ ভাগ ক্ষেত্রে ফসফেটযুক্ত পাথার।
ফসফেটযুক্ত পাথরকে ইনফেকশন পাথরও বলা হয়। কারণ ব্যাকটেরিয়ার বারবার সংক্রমণ থেকে এই পাথর তৈরি হয়। আর ৫-১০ ভাগ পাথর হলো ইউরিক এসিড পাথর।
– পাথর যাতে না হয় সেজন্যথপ্রতিদিন অন্তত দুই থেকে তিন লিটার পানি পান করতে হবে। নিয়মিত এভাবে পানি পান করলে পাথর হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে যায়।
– কমলা, জাম, লেবু পাথর হওয়ার হার কমায়। অন্যদিকে কোল্ডড্রিংকস, কফি, চা, আঙুরের রস, চকোলেট পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
– দীর্ঘসময় প্রস্রাব আটকে রাখার অভ্যাসও পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়।
কিডনি ও মূত্রতন্ত্রের পাথর সাধারণ একটি এঙ্-রে (কেইউবি) করলেই নির্ণয় করা যায়। এ ছাড়াও প্রয়োজনে পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাম, সিটিস্ক্যান, আইভিইউ পরীক্ষার মাধ্যমেও পাথরের অবস্থান নিশ্চিত হওয়া যায়।
পাথর ধরা পড়লে দ্রুত ইউরোলজিস্টের পরামর্শ নিয়ে পরীা করতে হবে। সময়মতো চিকিৎসা না করলে প্রচণ্ড ব্যথা হবে, বারবার ইনফেকশন হবে, কিডনি ও মূত্রনালি ফুলে গিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। ফলে কিডনি বিকল হতে পারে।
আবার একবার পাথর হলে আবারও পাথর হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

দীর্ঘমেয়াদি কিডনি বিকল রোগঃ-
ক্রনিক কিডনি ডিজিজ বা দীর্ঘমেয়াদি রোগের প্রকোপ বেশকিছু কারণে এখন আগের তুলনায় বেশি। এর কারণ উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বৃৃদ্ধি। এই দুটি রোগে কিডনির বেশকিছু জটিলতা দেখা দেয়। সবচেয়ে বেশি দেখা দেয় দীর্ঘমেয়াদি কিডনি বিকল রোগ। এ ছাড়া বড় রক্তনালির সমস্যা, রেনাল ধমনীর সমস্যা, পলিসিস্টিক কিডনি ডিজিজ ও কিডনি পাথরের কারণেও দীর্ঘমেয়াদি কিডনি বিকল রোগ হতে পারে।
এ রোগে কিডনির কার্যকারিতা কমে যায়, মুখ মণ্ডলে পানি জমে, রক্তচাপ বাড়ে, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যায়, রক্তশূন্যতা দেখা দেয়, দুর্বলতা ও কান্তি হয়, ওজন কমে যায়, বমি হয়, শরীরে চুলকানি হতে পারে, ত্বক শুষ্ক হয়, হাড়ে ব্যথা অনুভূত হয়।
এ ধরনের সমস্যা দেখা দিলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

যখন ডায়ালিসিস প্রয়োজন ঃ-22
সাধারণ কিডনি অসুখে ডায়ালিসিস প্রয়োজন হয় না। যখন কিডনির কার্যমতার পুরোটা বা বেশির ভাগ অংশ নষ্ট হয়, কিডনি যখন রক্ত পরিশোধনের কাজ করতে অসমর্থ হয় তখন ডায়ালিসিস করতে হয়। ডায়ালিসিস হলো একটি যন্ত্রের মাধ্যমে কিডনির মতো রক্ত পরিশোধনের কাজ করার পদ্ধতির নাম। সাধারণত ডায়ালিসিস হয় দুই ধরনের। হিমোডায়ালিসিস ও পেরিটোনিয়াল ডায়ালিসিস।বেশকিছু কিডনি অসুখে ডায়ালিসিস প্রয়োজন হয়। যেমন- মেটাবলিক এসিডোসিস হলে,- হাইপার ক্যালিমিয়া বা পটাসিয়ামের মাত্রা রক্তে বেড়ে গেলে,- শরীরে পানি বেশি জমলে,- রক্তে ইউরিয়ার মাত্রা বেড়ে গেলে,- পেরিকার্ডাইটিস-এনসেফালোপ্যাথি ও অন্ত্রে রক্তরণ হলে।

চিকিৎসা ঃ-হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার মাধ্যমে কিডনির যে কোনো সমস্যাসহ কিডনির পাথর ভেঙ্গে-চুরে বা গালিয়ে বের করে আনা সম্ভব হয়।

কিডনির পাথর অনেক ক্ষেত্রে এমনিতে বের হয়ে যায়। কিডনির পাথর চিকিৎসায় পাথরের আকার, আকৃতি ও অবস্থানের ওপর নির্ভর করে শরীরের বাইরের থেকে শকওয়েভ দিয়ে ভেঙে বের করে আনা যায় কিংবা অস্ত্রপচার করে পাথর বের করা যায়। এমন একটা পদ্ধতি, যা দ্বারা শরীরের বাহির থেকে যন্ত্রের সাহায্যে শকওয়েভ পাঠিয়ে পাথর ভেঙে ফেলা হয়। বৃক্কনালি এবং মূত্রাশয়ের পাথর আকার ও আকৃতির ওপর নিভর করে মূত্রনালির ভেতর দিয়ে যন্ত্রের সাহায্যে ভেঙে বের করে আনা যায় বা অপারেশন করে বের করে আনা যায়।
=============

প্রভাষক.ডাঃ এস.জামান পলাশ
জামান হোমিও হল

মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট,চাঁদপুর

01711-943435 // 01670908547
ইমু 01919-943435
চাঁদপুর হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

★ পোস্ট ভাল লাগলে লাইক ★ শেয়ার করে পেইজে একটিভ থাকুন
Face Book page : ( প্রতি মুহুর্তের চিকিৎসা বিষয়ক খবর গুলো নিয়মিত পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিন ) https://www.facebook.com/ZamanHomeoHall