বাড়িভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য

রাজধানী ঢাকায় বাড়িভাড়া নিয়ে নৈরাজ্য নতুন নয়। বছর বছর বাড়ছে বাড়িভাড়া। বছরের পর বছর ধরে রাজধানীতে চলছে বাড়িবাড়ায় নৈরাজ্য । অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, এ নিয়ে সরকারের ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো মাথাব্যথা নেই। আবাসনের তুলনায় ঢাকা মহানগরীতে দিন দিন জনসংখ্যার চাপ বাড়ছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাড়ির মালিকেরা নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নিজেদের মর্জিমাফিক বাড়িভাড়া বাড়াচ্ছেন। ভাড়াটেরা বাড়ির মালিকদের কাছে রীতিমতো অসহায়। তাদের দুর্ভোগ দেখার কেউ নেই! ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে নতুন যুক্ত ৩৬টি ওয়ার্ডে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগার সাথে সাথে বাড়িভাড়াও লাগামহীন বাড়ছে। সিটি করপোরেশনের অবস্থান ও এলাকাভেদে বাড়িভাড়া নির্ধারণের কথা থাকলে তা কার্যকর হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, বাড়িওয়ালারা নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে তিন-চারগুণ হারে ভাড়া আদায় করলেও হোল্ডিং ট্যাক্স ঠিকমতো পরিশোধ করেন না! ২০১৬ সালে রাজধানীতে বাড়িভাড়া বেড়েছে ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ। কিন্তু এ সময় নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে প্রায় সাড়ে ৫ শতাংশের মতো। অর্থাৎ নিত্যপণ্যের তুলনায় দেড়গুণ বাড়িভাড়া বেড়েছে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণবিষয়ক সংগঠন ‘কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের’ (ক্যাব) বার্ষিক প্রতিবেদন- ২০১৬-তে এ তথ্য উঠে এসেছে। ক্যাবের হিসাবে গত ২৫ বছরে রাজধানীতে বাড়িভাড়া বেড়েছে প্রায় ৩৮৮ শতাংশ। অথচ একই সময়ে নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে ২০০ শতাংশ। অর্থাৎ নিত্যপণ্যের দামের তুলনায় বাড়িভাড়া বাড়ার হার প্রায় দ্বিগুণ।

এক হিসাব মতে, রাজধানীতে প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ মানুষ ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। এদের বেশির ভাগই নিম্ন ও মধ্যআয়ের জনগোষ্ঠী। মোট আয়ের বেশির ভাগ ব্যয় হয় বাড়িভাড়ায়। এলাকাভেদে প্রত্যেক বছর এমনকি বছরের মাঝামাঝি সময়েও ৫০০ থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়িভাড়া বাড়াচ্ছেন মালিকেরা। রাজধানীতে বেশির ভাগ ভাড়াটের আয় বাড়ার হারের থেকে বাড়িভাড়া বাড়ানোর এ হার অনেক বেশি। বাড়িভাড়া বাড়ানোর এ অসঙ্গতি নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ওপর বিরূপ ফেলছে। ভাড়াটেরা পুরোপুরি বাড়ির মালিকদের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছেন! প্রশ্ন হলো, বাড়িভাড়া নিয়ে রাজধানীতে যে অরাজকতা চলছে তার অবসান হবে কবে? ক্যাবের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে ১৯৯০ সালে পাকা ভবনে দুই কক্ষের একটি বাসার ভাড়া ছিল দুই হাজার ৯৪২ টাকা। ২০১৬ সালে সেই ভাড়া দাঁড়িয়েছে প্রায় ২০ হাজার টাকা।

বর্তমানে প্রচলিত ‘বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন’টি ১৯৯১ সালের। সরকার এখনো এ আইনের বিধিমালা করেনি। নেই আইনের প্রয়োগও। আইনে বলা হয়েছে, কোনো ভাড়াটের কাছে জামানত বা কোনো টাকা দাবি করতে পারবেন না বাড়িওয়ালা। এক মাসের বেশি অগ্রিম ভাড়া নেয়া যাবে না। প্রতি মাসে ভাড়া নেয়ার রশিদ দিতে হবে, নইলে বাড়িওয়ালা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। দুই বছর পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো যাবে না। ভাড়াটেদের স্বার্থরক্ষায় এমন আরো অনেক কথাই বলা আছে এ আইনে। কিন্তু বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগ নেই।

‘বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৯১’ কার্যকর করতে ২০১০ সালে একটি মানবাধিকার সংগঠনের রিটের সূত্র ধরে সর্বোচ্চ আদালত বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ কমিশন গঠনের কথা বলেছিলেন। তবে কমিশন এখনো গঠিত হয়নি। এই সুযোগ আর ভাড়াটেদের চাহিদা কাজে লাগিয়ে বাড়ির মালিকেরা ভাড়া বাড়িয়ে যাচ্ছেন। ফলে ভাড়াটেরা বছরের পর বছর অর্থনৈতিকভাবে নিষ্পেষিত হচ্ছেন। ভাড়াটেরা তাদের এ অসহায় অবস্থার কথা কাউকে বলতে পারছেন না। নিরূপায় হয়ে মুখ বুজে সব সহ্য করে যাচ্ছেন। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ কাজটি সরকারের কোনো সংস্থার বা প্রতিষ্ঠানের তা এখনো ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছে। দ্রুত রাজধানীর ভাড়াটেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় যথাযথ উদ্যোগ নেয়া জরুরি।

তা না হলে এ নৈরাজ্য থেকে ভাড়াটিয়াদের সহজে মুক্তি মিলবে বলে মনে হয় না। বিদ্যমান আইনের পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করে ভাড়াটেদের স্বার্থ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবি। এখন রাজধানীর কাজ ও সেবা দুই সিটি করপোরেশনে বিভক্ত করে সম্পাদন করা হয়। রাজধানীর বাড়িভাড়ার ব্যাপারে সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব রয়েছে। দুই সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বিদ্যমান বাড়িভাড়া আইন সংস্কারের মাধ্যমে যুগোপযোগী করে এবং এর সাথে সমন্বয় করে এলাকাভেদে কিংবা ওয়ার্ডভিত্তিক বাড়িভাড়া নির্ধারণের উদ্যোগ নিতে পারে। এ ছাড়া সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ দিয়ে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের ফ্ল্যাট তৈরি ও বরাদ্দের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। দ্রুত রাজধানীর বাড়িভাড়া ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরে আসুক- এমনটাই প্রত্যাশা নগরবাসীর।